ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে পার্লামেন্টে শপথগ্রহণ করেছেন দেশটির কট্টরপন্থি শিয়া মতাবলম্বী ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ আইনজীবী ইব্রাহিম রাইসি। দেশে এবং বিদেশে ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে ইসলামি এই প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বৃহস্পতিবার (৫ আগস্ট) শপথ নেন তিনি।
গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এই শিয়া নেতার আনুষ্ঠানিকভাবে চার বছরের মেয়াদের অভিষেক হয়েছে গেল মঙ্গলবার। ওইদিন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নির্বাচনে ইব্রাহিম রাইসির জয়ের স্বীকৃতি দেন। ওই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের অযোগ্য ঘোষণা করায় রাইসির জয়ের পথ সুগম হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাইসির প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালে ইরানের ক্ষমতার সব শাখা-প্রশাখাই পশ্চিমা-বিরোধী খামেনির অনুগত কট্টরপন্থিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। এদিন বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত শপথ অনুষ্ঠানে রাইসি বলেছেন, পবিত্র কুরআন এবং জাতির সামনে, আমি সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছে দেশের ধর্ম এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পাশাপাশি সংবিধান রক্ষার শপথগ্রহণ করছি।
বিচারপতি থাকাকালীন বিরোধীদের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ইরানের নতুন এই প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত আগের নিষেধাজ্ঞা এখনো কার্যকর আছে। তারপরও তিনি শপথ অনুষ্ঠানে দেশটির ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের তেল রফতানি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
শপথগ্রহণের পর দেশের কল্যাণে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন ইব্রাহিম রাইসি। তার মতে, ইরানি জনগণ প্রত্যাশা করে নতুন সরকার তাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটাবে। ইরানিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত সকল অবৈধ নিষেধাজ্ঞা অবশ্যই প্রত্যাহার করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালে ছয় প্রধান বিশ্ব শক্তির সঙ্গে সাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। গেল তিন বছর আগে ইরানের প্রতি চুক্তিতে নমনীয়তা প্রদর্শন করা হচ্ছে অভিযোগ এনে ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটি থেকে নিজ দেশকে প্রত্যাহার করে নেন।
গুরুত্বপূর্ণ সেই চুক্তি অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়েছিল। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। যে নিষেধাজ্ঞায় দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীকালে তেহরান চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের মাধ্যমে আবারও পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করে।
তবে খামেনির মতোই রাইসিও পারমাণবিক চুক্তির আলোচনায় সায় দিয়েছেন। থমকে যাওয়া পারমাণবিক চুক্তিকে সচল করার আলোচনায় তিনি কঠোর পন্থা অবলম্বন করতে পারেন বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও পারমাণবিক নীতিসহ দেশটির সব বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
২০১৯ সালে দেশটির বিচারবিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইব্রাহিম রাইসি। তখন তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। যদিও নিয়োগের কয়েক মাস পরই ১৯৮৮ সালে দেশটির হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন এই শিয়া নেতা। যদিও ইরান কখনই ওই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ স্বীকার করেনি।
আয়াতুল্লাহ খামেনির অত্যন্ত আস্থাভাজন রাইসি বলেছিলেন, বিচারকের দায়িত্ব পালনের জন্যই আমার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তাই রাইসির প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালে ইরানে দমন-পীড়ন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইরানের ভিন্নমতাবলম্বীরা।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ রাসেল আলী
©২০২০-২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || পাবনা নিউজ পোস্ট.কম