ঢাকাSunday , 29 June 2025
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঈশ্বরদীতে শিক্ষকের বিদায়ে শিক্ষার্থীদের চাঁদায় ৭০০ লোকের ভূড়িভোজের প্রস্তুতি

Link Copied!

শেয়ার করুন...

অবসরে যাওয়া প্রধান শিক্ষক মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হওয়ায় উপজেলার সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার রুটিনে ৩০ জুন ছুটি রেখে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে।

একজন প্রধান শিক্ষকের বিদায় সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে পরীক্ষার রুটিন পরিবর্তনের ঘটনায় পুরো উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাসহ বিদ্যালয়গুলো শিক্ষক সমিতির নিকট জিম্মি বলে দাবী করছেন অভিভাবকসহ সাধারণ শিক্ষক/শিক্ষিকাবৃন্দ। আর এই বিদায় সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজিনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রায় ৭ শ লোককে করানো হবে ভুরিভোজ। এই জন্য প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে গরু ও খাসি।

রোববার (২৯জুন )দুপুর ১২টায় উপজেলার নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস উচ্চ বিদ্যালয় ঘুরে ও শিক্ষক শিক্ষিকাসহ বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাকশী নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফজলুল হক। তিনি ঈশ্বরদী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি। আগামীকাল ৩০ জুন তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শেষ কর্ম দিবস। এই জন্য দিনকে স্মরনীয় ও ঈশ্বরদীতে আলোচিত করতে বিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষককে দিয়ে তিনি বিদ্যালয় ফান্ডের কয়েক লক্ষ টাকা খরচে এ বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করাচ্ছেন। এছাড়াও বর্তমান সকল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নাম মাত্র এ অনুষ্ঠানের দোহাই দিয়ে উঠানো হয়েছে ।

এমন কি উপজেলার সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকাদের বিদায় সংবর্ধনায় উপস্থিত করতে ইতোপুর্বে প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে সভা করেছেন। সেই হিসেবে সরকারী নিয়মের তোয়াক্কা না করে সংবর্ধনার দিন ৩০ জুন উপজেলার সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকারের আদেশ রয়েছে সরকারি ছুটি ব্যতিত সকল দিনে পরীক্ষাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলবে। পরীক্ষা না থাকলে বিদ্যালয়ে পাঠদান চলবে। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে ঈশ্বরদী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শুন্য রয়েছে। একজন একাডেমিক সুপার ভাইজার দিয়ে কোন মতে চলছে অফিস। ফলে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানে চলছে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। যেনো দেখার কেউ নেই।

 

 

পাকশী নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক সদস্যরা অভিযোগ করে জানান, প্রধান শিক্ষক মো. ফজলুল হক আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে স্থানীয় আওয়ামীলীগের ৫জন প্রভাবশালী নেতাকে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য করেন। বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেনীতে নতুন করে চারটি করে শাখা চালু করেন। এইজন্য বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আওয়ামীলীগের নেতাদের একজনের স্ত্রীকে, একজনের ছেলের স্ত্রী ও একজনের ভাইয়ের স্ত্রীকে শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি প্রদান করেন।

নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদাধিকার বলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি থাকেন। কিন্তু মিলটি বিলুপ্ত হওয়ায় সেখানে পেপার মিলের কোন কর্মকর্তা আর পাকশীতে থাকেন না। এই সুযোগে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে যোগসাজছে প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক নানা অনিয়ম, দূর্নীতি ও ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন।
বিদ্যালয় ফান্ডের টাকা দিয়ে শহরের জমি কেনাবেচার করেন। এমপিও ভুক্ত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক হিসেবে ফজলুল হক কিভাবে শহরে অন্তত এক বিঘা জমি কিনতে পারেন, কিভাবে কোটি টাকা খরচ করে বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান রেখেছেন। নিজের গ্রামে ১৫ বিঘা জমি কিনতে পারেন না।
অতি দাপটের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ সভাপতি পদ লাভ করেন। কিন্তু ৫ আগষ্টের পর নিজের কুল রক্ষা করতে প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক নিজের ভোল পাল্টিয়ে খাসি জবাই করে স্থানীয় বিএনপির প্রভাশালী নেতাকর্মীদের বিদ্যালয়ে ডেকে এনে ভুরিভোজও করিয়েছেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে জানান, পেপার মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হয়ে সমিতির ফান্ডের অন্তত ১২-১৫ লাখ টাকা আত্মসাত করেন। পরবর্তিতে সমিতির শিক্ষকদের নিকট ক্ষমা চেয়ে সমিতির ফান্ডে সাড়ে তিন লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। এসব নিয়েও আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ভাষা শহীদ বিদ্যানিকেতনের প্রধান শিক্ষক মো. মুক্তার হোসেন বলেন, অভিযোগ গুলো সঠিক নয়। নিয়ম মেনেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষানমাসিক পরীক্ষার রুটিন হয়েছে। পরীক্ষাও চলছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুবীর কুমার দাস বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। এব্যাপারে কেউ আমাকে জানাননি। বিষয়টি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেখেন।
ঈশ্বরদী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্ত সুজানগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সোলাইমান হোসেন বলেন, আমি ঈশ্বরদী উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার আগেই পরীক্ষার রুটিন হয়েছে। এই বিষয়ে আমি বলতে পারবো না। তবে প্রধান শিক্ষক ফজলুল হকের বিদায় সংবর্ধনার দিনে পরীক্ষা না হলেও পেপার মিলসসহ সকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেনীর শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলবে। বিদায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমারও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
বিলুপ্ত পাকশী নর্থবেঙ্গল পেপার মিলের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবুল খায়ের মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আমি গত এক বছর ধরে বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। আমি ভুয়া বিল ভাউচার স্বাক্ষর করি না। পূর্বে যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের সঙ্গে যোগসাজছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মাসাত করলে তারা দায়ি।
বিদায় সংবর্ধনায় গরু খাসি কেটে ভুরিভোজের প্রস্তুতির বিষয়ে বিদ্যালয় ফান্ডের অর্থ ব্যয় হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে এমডি বলেন, ফান্ড থেকে কোন টাকা খরচ হওয়ার কথা নয়। শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের নিকট থেকে কিছু চাঁদা নিয়ে তাদের চা বিস্কুট খাওয়া হবে বলে শুনেছি। সেখানে আমিও অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবো। আর পরীক্ষা বন্ধ রাখার বিষয়টি শিক্ষা কর্মকর্তা বলতে পারবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও নর্থবেঙ্গল পেপার মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ফজলুল হক বলেন, এসব তথ্য সঠিক নয়। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, আয়োজনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গরু খাসি জবাই করে আমাকে বিদায় সংবর্ধনা দিবে না পায়ে হেঁটে বিদায় দিবে সেটা তাদের বিষয়।

শেয়ার করুন...

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
error: Content is protected !!